নতুন ধারার অপরাধ এটিএম হ্যাকিং হয়ে উঠেছে ঝুঁকিপূর্ণ
২০১৯-২০২০ সালে দেশে সাইবার অপরাধের মধ্যে আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে সামাজিক মাধ্যমসহ অন্যান্য অনলাইন একাউন্ট হ্যাকিং বা তথ্য চুরি। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশনের (সিসিএ ফাউন্ডেশন) গবেষণায় এটিএম কার্ড হ্যাকিংয়ের মতো একটি নতুন অপরাধ শনাক্ত করা হয়েছে। এছাড়া করোনাভাইরাস পরিস্থিতির ফলে অনলাইনে কেনাকাটা বৃদ্ধি পাওয়ায় আগের তুলনায় অধিক মাত্রায় মানুষ অনলাইনে পণ্য কিনতে গিয়ে প্রতারণার শিকার হয়েছেন। সার্বিকভাবে দেশে সুস্থ সাইবার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠায় সরকারি-বেসরকারি অংশীজনদের নিয়ে ‘সাইবার স্কোয়াড’ গঠনের পরামর্শ উঠে এসেছে গবেষণা প্রতিবেদনে।
সিসিএ ফাউন্ডেশনের ৬ষ্ঠ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ‘বাংলাদেশে সাইবার অপরাধ প্রবণতা-২০২১’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনটি শুক্রবার প্রকাশ করা হয়।
সংগঠনের সভাপতি কাজী মুস্তাফিজের সভাপতিত্বে অনলাইনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার।
এছাড়া প্যানেল আলোচক ছিলেন, দৈনিক প্রথম আলোর যুব কর্মসূচি বিভাগের প্রধান মুনির হাসান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারপারসন খন্দকার ফারজানা রহমান, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ফরেনসিক) মো. মোস্তফা কামাল রাশেদ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক কাজী আনিছ, বাংলাদেশ ইন্টারনেট গভর্ন্যান্স ফোরামের মহাসচিব এম এ হক অনু এবং শিশুদের সাইবার সুরক্ষা বিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা প্রটেক্ট আস কিডসের বাংলাদেশ প্রতিনিধি শারমিন নাহার লিনা।
গবেষণা প্রতিবেদনের বিস্তারিত তুলে ধরেন সিসিএ ফাউন্ডেশনের রিসার্চ সেলের আহ্বায়ক এবং ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সিনিয়র লেকচারার মনিরা নাজমী জাহান।
সিসিএ ফাউন্ডেশনের নিয়মিত জরিপভিত্তিক এই গবেষণা প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয় মোট ১১টি ট্যাবে। সেখানে সামগ্রিক ফলাফলে দেখা গেছে দেশে চার ধরনের অপরাধের মাত্রা কমেছে। অন্যদিকে ছয় ধরনের অপরাধের মাত্রা বেড়েছে।
বছর ঘুরতে না ঘুরতেই সাইবার জগতের নানা মাত্রিক বিকাশের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বিচিত্ররূপে হাজির হচ্ছে এই ধরনের অপরাধ। আমজনতার মধ্যে এসব অপরাধে আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে । তবে সাইবার অপরাধে আক্রান্ত হওয়ার পরেও আইন-শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর কাছে এই ভুক্তভোগীদের অভিযোগের হার হতাশাজনক। অপরাধের বিশ্লেষণে বলা হয়, দেশে ‘সাইবার সচেতনতা’ বাড়ানোর পাশাপাশি ‘সাইবার লিটারেসি’ও বাড়াতে হবে।
গবেষণায় সাইবার অপরাধের তুলনামূলক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রথম স্থানে রয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ অন্যান্য অনলাইন একাউন্ট হ্যাকিংয়ের ঘটনা, যার হার ২৮.৩১ শতাংশ। যেখানে ২০১৯ সালের প্রতিবেদনে এই হার ছিল ১৫.৩৫ শতাংশ, যা এবারের তুলনায় প্রায় ১৩ শতাংশ কম ছিল। যদিও ২০১৯ সালের প্রতিবেদনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচারের ঘটনা ছিল ২২.৩৩ শতাংশ, কিন্তু এবার এই সংখ্যা কমে গিয়ে দাঁড়ায় ১৬.৩১ শতাংশে।
অপরাধের ধরনে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে অপপ্রচার। অবশ্য আশার কথা, এই অপরাধের পরিমাণ কিছুটা কমেছে। গতবারের গবেষণায় যেখানে এই অভিযোগ ছিল ২২ দশমিক ৩৩ শতাংশ। এবার তা কমে হয়েছে ১৬ দশমিক ৩১ শতাংশ। কিন্তু যৌন হয়রানিমূলক একান্ত ব্যক্তিগত মুহূর্তের ছবি/ভিডিও (পর্ণোগ্রাফি) ব্যবহার করে হয়রানির মাত্রা বেড়েছে। অপরাধের মাত্রাটি আগের ৬ দশমিক ০৫ শতাংশ থেকে বেড়ে এবার হয়েছে ৭ দশমিক ৬৯ শতাংশ। তবে কমেছে ফটোশপে ভুক্তোভোগীর ছবি বিকৃতি করে হয়রানির ঘটনা। এই অপরাধের হার গতবারের চেয়ে এবার অর্ধেকের নিচে নেমে দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৮৫ শতাংশে।
এদিকে অপরাধের মাত্রায় অনলাইনে মেসেজ পাঠিয়ে হুমকি দেয়ার ঘটনা এবার তৃতীয় শীর্ষ অবস্থানে উঠে এসেছে। তবে এই অপরাধের মাত্রা গতবারের প্রতিবেদনের তুলনায় প্রায় তিন শতাংশ কমে নেমে এসেছে ১৪ দশমিক ১৬ শতাংশে, যা গতবার ছিল ১৭.৬৭ শতাংশ।